পরকীয়া হচ্ছে বিবাহিত জীবন থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো নারী বা পুরুষের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। বেশির ভাগ পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে নারী বা পুরুষের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটানোর জন্য। এর ফলে নিজের লুকানো সম্পর্ক জেনে ফেলায় কখনও কন্যাকে হত্যা করেছেন বাবা, কখনও সম্পর্কের পথ মসৃণ করতে শিশুসন্তানকে হত্যা করছেন মা। আবার স্বামী-স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকেও হত্যা করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই হত্যাকাণ্ড আবেগবশত হঠাৎ করে ঘটিয়ে ফেলা হত্যা নয়, রীতিমতো পরিকল্পনা করে আটঘাট বেঁধেই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হচ্ছে।
আমাদের সমাজে এমন কি ধর্মেও এই পরকীয়া সম্পর্ককে অবৈধ সম্পর্ক হিসেবে বলা হয়েছে। কিন্তু কখনও কি আমরা এটা জানার বা বোঝার চেষ্টা করেছি, কেনো আমাদের সমাজে, আমাদের দেশে এই সম্পর্কের হার বেড়ে গিয়েছে? নারী বা পুরুষ তাদের বিবাহিত জীবন নিয়ে কি সন্তুষ্ট নন? আমাদেরই বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আজ এই পরকীয়া সম্পর্কের হার বেড়ে গিয়েছে এবং ঘরে ঘরে তালাক বা ডিভোর্স হচ্ছে। নিম্নে পরকীয়ায় জড়ানোর প্রধান কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলো—
শারীরিক সমস্যা,বিবাহিত জীবনে এটি হচ্ছে প্রধান সমস্যা। এই সমস্যাটি তখনই দেখা দেয়, যখন স্বামী ও স্ত্রী সমবয়সী হয় অথবা স্বামীর থেকে স্ত্রী যদি বয়সে বড় হয়ে থাকে। যার কারণে সেসব স্বামী বা স্ত্রী বাইরের অন্য কারো সাথে পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে।
বিয়ের ক্ষেত্রে ভুল মানুষকে নির্বাচন,মূলত এই সমস্যাটি অনেক বেশি বেশি দেখা যায়। অনেক সময় অভিভাবকরা তাদের নিজেদের কথাই ভাবেন এবং ভাল-মন্দ কোনো কিছু না দেখে-শুনে অনেক তাড়াহুড়ো করেই তাদের সন্তানদের বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ের পছন্দ বা মতামতকে তারা প্রাধান্য দেন না। ফলে এসব ছেলে-মেয়েদের বিবাহিত জীবন সুখের হয় না। আর তখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পরবর্তীতে তারা পরকীয়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
বিয়ের অল্প কিছুদিন পরই অভিভাবক হওয়া,কথাটি বেশ কড়া হলেও এটাই বাস্তব, বিয়ের পর স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যের মধুর সম্পর্কে তখনি ব্যাপক পরিবর্তন আসে, যখন তারা অভিভাবক হয়ে যান। একটা সন্তান পরিবারে আসার পর মূলত সন্তানের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সন্তানের নিয়ে অতি ব্যস্ত থাকায় স্বামী-স্ত্রী কেউই একে অপরকে সময় দিতে পারছে না। যার কারণে আগের মত সেই মায়া, ভালবাসা থাকে না। তখনই সেসব পুরুষ বা নারীদের মন বাইরে চলে যায় অর্থাৎ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।
ক্যারিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট,খুব দুঃখজনক হলেও, এটাই সত্যি। কিছু পুরুষ বা নারী তার ক্যারিয়ার প্রমোশন দ্রুত বৃদ্ধি করার জন্য তার কর্মস্থল এর ম্যানেজার কিংবা উপরের লেভেলের বসদের সাথে পরকীয়া সম্পর্কে লিপ্ত হন। কারণ তারা মনে করেন এতে করে তারা জব এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাবেন। কিন্তু এটা সম্পূর্ণই ভুল চিন্তা! উল্টো এটা একটা মানুষের ব্যক্তিস্বত্তা, তার চরিত্র স্বত্তাকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায়। এসব সম্পর্কও যেমন বেশিদিন টিকে না, ঠিক তেমনি চাকরি হারানোরও আশঙ্কা থাকে। পরবর্তীতে এগুলোর প্রভাব পড়ে পরিবারের সন্তানদের উপর। বিশ্বাস, ভালোবাসা, সম্মান সবকিছুই বিনষ্ট হয়ে যায়, এই সাময়িক পরকীয়া সম্পর্কে।
সমাধান,সাধারণত দেখা গেছে, পেশাগত জীবনে যিনি নৈতিকতার চর্চা করেন, তিনি পারিবারিক জীবনেও বিশ্বস্ত থাকেন। আর পেশাগত দিকে অসৎ মানুষই বেশির ভাগ সময় পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছেন। তাই পেশাগত জীবনেও সৎ থাকা জরুরি। প্রচারমাধ্যমকে হতে হবে দায়িত্বশীল। পরকীয়ার কারণে খুনের সংবাদগুলো এমনভাবে পরিবেশন করতে হবে, যাতে এই সংবাদ থেকে কেউ পরকীয়ার পথকে সুগম করতে খুনকে একটা উপায় হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত না হয়। এই নৃশংস আচরণ রোধ করতে হলে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কোনো লুকোচুরি রাখা চলবে না।
সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন সামাজিক আচরণ, তেমনি সামাজিক নিয়ম মেনে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাও সমাজসিদ্ধ আচরণ। এর বাইরে গিয়ে নৃশংস আচরণ করার কোনো সুযোগ নেই। পারিবারিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে গুণগত সময় দেবেন। পরিবারে সহনশীলতা আর মিলেমিশে থাকার চর্চা বাড়াতে হবে। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান দেখানোও জরুরি।